Wednesday, May 19, 2021

Mrinal Datta Chaudhuri

Mrinal Datta Chaudhuri, retired Professor of Economics at the Delhi School of Economics passed away today. He was one of a kind, a vanishing breed, both as an academic and as a person. Back in 1990 I took a topics course in the second year of the Master's programme, called Transport, Infrastructure, and Planning (as far as I can recall) just because MDC (as we called him then) taught it even though the course title did not sound very attractive at that point with game theory and information economics in the air! Other than learning some really interesting economic applications of certain mathematical methods, there were fabulous anecdotes that were worth their weight in gold. All delivered with his unique style (laconic air, short sentences, and an accent that had traces of both Sylhet and Boston). As a person he was caring, warm and affectionate yet in a very dry and no-nonsense way. A few years after graduating from Delhi School when I was a second year PhD student at Harvard, he looked me up during one of his regular visits to the Boston area, and then as a way of starting the conversation drily remarked "You look prosperous" referring not to the tight budget of a graduate student but to a bit weight I had put on, which was not hard given how skinny I was earlier.

He never published up a storm but was widely respected for his erudition and brilliant insights. I once asked him what his life philosophy was, and he said to do the things one likes and get through the day without unnecessarily hurting someone's feelings. This was interesting coming from someone who could be quite tough in terms of taking stands and calling out nonsense (for example, he was outspoken in his opposition to the Emergency.)

I feel privileged to have had many chats with him over the years, and graduated (with some initial trepidation) from calling him "Sir" to "Mrinalda".

Will carry on our conversations in my head.






Friday, April 16, 2021

বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি?

"আরেক রকম" পত্রিকায় আমার আর অমিতাভ গুপ্তের যৌথ রচনা "বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি?" আলোচ্য বিষয় - অর্থনীতির ভিত ছাড়া সংস্কৃতি কি মজবুত রাজনীতির দেওয়াল হতে পারে?

সূচীপত্র-সহ লেখাটির লিংক এখানে দিলাম। পড়তে অসুবিধে হলে, নিচে পুরো লেখাটা কপিও করে দিলাম।

https://personal.lse.ac.uk/ghatak/arekrakam2.pdf


আরেকরকম পত্রিকার তরফে ঘোষণা:

লকডাউনের পরে প্রথমবার আরেক রকম প্রকাশিত হলো মুদ্রিত আকারে। কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের বুকস্টলে এই বই কিনতে পাওয়া যাবে। গ্রাহকদের ডাকের মাধ্যমে পত্রিকা পাঠানো হবে। গ্রাহক পরিষেবার জন্য যোগাযোগ করুন: শ্রী রবিন মজুমদার: ৯৪৩২২১৯৪৪৬। কলেজ স্ট্রিটে পাতিরাম বা ধ্যানবিন্দু-তে পাওয়া যাবে।


বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি?

মৈত্রীশ ঘটক ও অমিতাভ গুপ্ত

 

অর্থনীতির ভিত ছাড়া সংস্কৃতি কি মজবুত রাজনীতির দেওয়াল হতে পারে?

আমরা যখন এই প্রবন্ধ লিখছি, রাজ্যে তখন বিধানসভা নির্বাচন চলছেতাই বাংলার রাজনীতি থেকে নজর অন্য দিকে ঘুরিয়ে রাখা কার্যত অসম্ভব। এই নির্বাচনে অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক-সামাজিক অনেকগুলো পরিচিত উপাদান মিশেছে, আর তাঁর ওপর রাজ্যে এবং কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দলগুলির প্রতি বিক্ষোভ তো আছেই। কিন্তু এ বারের নির্বাচনে দুটো বেশ অভিনব উপাদান এই পরিচিত মিশ্রণে সংযোজিত হয়েছেপ্রথমত, সাম্প্রতিক কালে এই প্রথম রাজ্য নির্বাচনে মতাদর্শের দিক থেকে তিনটে খুব আলাদা ধারার রাজনীতির মধ্যে ত্রিমুখী দ্বন্দ্বতৃণমূল কংগ্রেস, বিজেপি, এবং বাম-জোট। এর আগেও তৃণমূল, বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের মধ্যে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে, কিন্তু কংগ্রেসের সঙ্গে ২০১১ সালে তৃণমূলের এবং ২০১৬ সালে বামফ্রন্টের নির্বাচনী সমঝোতা ছিল। কিন্তু আরও বড় কথা, মতাদর্শগত ভাবে বিজেপি বাকি দলগুলি থেকে অনেকটা আলাদা। তার একটা দিক অবশ্যই হল হিন্দুত্ববাদ এবং বিভাজনের রাজনীতি। কিন্তু আর একটি দিক নিয়ে তুলনায় আলোচনা কম হচ্ছেসেটা হল, সাংস্কৃতিক। বিজেপি মূলত উত্তর ও পশ্চিম ভারতীয় একটি দল, যার বাংলার মাটিতে শিকড় খুব গভীর নয়।

কেউ কেউ বলছেন বটে যে, বিজেপি আসলে ঘরে ফিরছেতার পূর্বসূরি ভারতীয় জনসঙ্ঘের জন্ম তো এই বাংলার মাটিতেইকিন্তু সে কথা যদি মেনেও নেওয়া যায়, তবু এই জন্মান্তরে বিজেপির রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে বাঙালিত্ববা বাঙালিয়ানাবলতে আমরা যা বুঝি, তার কিছু মৌলিক বিরোধ আছে। সেই বিরোধের কথা তুলেও অনেকে বলছেন, ‘বাঙালিত্বেরঅস্তিত্বরক্ষার জন্য বিজেপিকে আটকানো দরকার। অনেকে আবার আশা করছেন, চরিত্রে মৌলিক ভাবে বাঙালিত্বেরমিশ্রণ কম হওয়ার কারণেই বিজেপি শেষ অবধি বাংলায় বহিরাগতহয়েই থেকে যাবে, রাজ্যের রাজনৈতিক ক্ষমতা তাদের নাগালে আসবে না। এখানে বলে রাখা ভাল যে, ‘বাঙালিত্বকথাটাকে এখানে সাংস্কৃতিক অর্থে ব্যবহার করা হচ্ছে, আঞ্চলিকতার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নয়। কেউ যেমন বাংলায় জন্মে, বসবাস করে, এবং আঞ্চলিক পরিচিতির দিক থেকে বাঙালি হয়েও বাঙালিত্ব-বর্জিত হতে পারেন, আবার সে রকমই কেউ বাংলার বাইরে (এমনকি বিদেশে) জন্মে বা বাংলার বাইরে বসবাস করে বা আঞ্চলিক পরিচিতির দিক থেকে বাঙালি না হয়েও বাঙালিত্বে সম্পৃক্ত হতে পারেন। 

রাজনীতির ময়দানে শেষ অবধি কী হবে, সেই প্রশ্নে ঢুকব না। বরং প্রশ্ন করা যাক, বাঙালিত্ব বলতে কী বোঝায়?

এটা ঘটনা যে, ভারতের সব রাজ্য বা অঞ্চলেরই যেমন নিজস্ব সাংস্কৃতিক চরিত্র ও সামাজিক রীতিনীতি আছে, সে বিষয়ে একটা গর্বও আছে। বাঙালির বাঙালিত্বই হোক, গুজরাতি অস্মিতাই হোক, মরাঠি মানুসই হোক, তামিলনাড়ু থেকে পঞ্জাব, কেরল থেকে কাশ্মীর, অসম থেকে রাজস্থান, নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান আর তার সঙ্গে স্থানীয় সংস্কৃতি নিয়ে গর্বএই দুটো দিকই দেখতে পাওয়া যাবে। বাঙালিত্বনামক বায়বীয় বস্তুটিকে যদি ভেঙে অথবা খুলে দেখা যায়, তা হলে তার কয়েকটা সুনির্দিষ্ট দিকচিহ্ন পাওয়া যাবে। উনিশ শতকের নবজাগরণ থেকে পাওয়া উদার বিশ্ববীক্ষা, বহুত্ববাদে বিশ্বাস, বিজ্ঞানমনস্কতা যেমন তার একটি দিক, তার আর এক দিক হল লোকসংস্কৃতির এক বহমান ধারা, যাতে যুগে যুগে বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা ও দর্শনের উপধারা এসে মিশেছেযেমন বাউল গান, যাতে আধ্যাত্মিকতা ও প্রেমের সঙ্গে মিশেছে  মানবিকতা ও সমন্বয়ী ভাবধারার কোমল স্পর্শ। তেমনই আবার বাংলা ভাষা, ও সেই ভাষাবাহিত সংস্কৃতিও এই বাঙালিত্বের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। বস্তুত, সেই সংস্কৃতির মধ্যেই বাঙালিত্বের অন্যান্য চরিত্রলক্ষণগুলি ঢুকে পড়ে। অর্থাৎ, বাঙালিত্ব বস্তুটি মূলত তার সংস্কৃতির মধ্যে নিহিত রয়েছে। নিন্দুকে বলবে যে, অলস, উদ্যোগহীন, মুখেন মারিতং জগৎ চরিত্রটিও বাঙালির মজ্জাগত; অথবা গোষ্ঠী-উপগোষ্ঠী তৈরি করে নিরন্তর কোন্দল করে চলাও বাঙালিত্বের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। কিন্তু, প্রথমত এ হল মূলত বাঁধা মাইনের চাকুরিজীবী মধ্যবিত্ত শ্রেণি সম্পর্কে একটা ছাঁচে ফেলা সামাজিক পর্যবেক্ষণতার বাইরে একটা বড় শ্রেণির মানুষের ক্ষেত্রে কথাটি খাটে না। আর তা ছাড়া চরিত্রের এই দিকগুলো নিয়ে কেউ গর্ব করেন বলে সন্দেহ হয় না। অতএব, যে বাঙালিত্বের সঙ্গে বিজেপির ভাবধারার চরিত্রগত বিরোধ, এবং যে বাঙালিত্বের অস্ত্রে এই সাম্প্রদায়িক শক্তিকে ঠেকানোর কথা ভাবছেন কেউ কেউ, সেটা মূলত সাংস্কৃতিক, ইতিবাচক বাঙালিত্ব।

আমরা জানি যে, ‘সংস্কৃতিকথাটির মধ্যে অনেক কিছু নিহিত আছেতাই ভুল বোঝাবুঝির সম্ভাবনাও থেকে যায়। এক দিকে সংস্কৃতি বলতে যেমন শিল্প সাহিত্য সংগীত এবং সে বিষয়ে রুচি বোঝায়, তেমন আবার কথাটি জীবনদর্শন, মূল্যবোধ, সামাজিক রীতিনীতি, ও আচার-আচরণ ইত্যাদি বোঝাতেও ব্যবহার করা হয়। তথাকথিত উচ্চমার্গের (যাকে high brow বা elite culture বলা হয়) এবং লোকসংস্কৃতির মধ্যে তফাৎ আছে, তথাকথিত শিক্ষিত নাগরিক শ্রেণির কাছে সংস্কৃতি বলতে যা বোঝায়, তার বাইরেও সংস্কৃতির একটা বড় পরিধি আছে এবং এ সবের মধ্যে সম্পর্ক সব সময়ে অনায়াস সমন্বয়ের বা প্রীতিমূলক সহাবস্থানের, তা-ও নয়।   কিন্তু একই কথা খাটে বাংলা ভাষার ক্ষেত্রেকে ব্যবহার করছেন, কোথায় ব্যবহৃত হচ্ছে, কী ভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তার মধ্যে অনেক বৈচিত্র; কিন্তু তা সত্ত্বেও একটা সাধারণ চরিত্র আছে বলেই তাকে আমরা বাংলা ভাষা বলে বর্ণনা করি। তাই আপাতত এই জটিলতা সরিয়ে রেখে আলোচনার সুবিধার্থে বাংলা সংস্কৃতিবলে একটা কিছু আছে, সেটা ধরে নিয়েই এগোনো যাক। 

এখানে প্রশ্ন উঠতেই পারে, কোন বা কার বাংলা সংস্কৃতির কথা বলা হচ্ছেযতই হোক, বাংলা সংস্কৃতির মধ্যে বহু ধারা মিশে আছে, তার কোনটা উচ্চ কোনটা নিম্নমার্গের, কোনটা কালোত্তীর্ণ কোনটা সাময়িক, তা কে ঠিক করবে? আর এই লেখাটিতে যে উদাহরণগুলো দেব, তার থেকে মনে হতে পারে যে, আমরা এক ধরনের নাগরিক এলিট বঙ্গসংস্কৃতিকেই "উচ্চমার্গের" সংস্কৃতি বলছি।  এখানে দুটো কথা বলা দরকার। আমরা আমাদের নিজস্ব  অভিজ্ঞতা ও পরিচিত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বলয়ের থেকে উদাহরণগুলো নির্বাচন করেছি, তাই এই চয়ন নৈর্ব্যক্তিক নয়যে কোনও ব্যক্তি-অভিজ্ঞতা সূত্রে আহৃত উদাহরণের মধ্যে তার নির্বাচনে একটা পক্ষপাত থাকতে বাধ্য।  তার মধ্যে কোনও শ্রেণিবিভাগ করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়লালন ফকিরের গান আর রবীন্দ্রসংগীত, পাঁচালি আর হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গান, সলিল চৌধুরীর গণসংগীত আর শচীন বা রাহুল দেব বর্মণের আধুনিক গান, পটশিল্প থেকে নন্দলাল বসু, চিত্তপ্রসাদ  থেকে গণেশ পাইনএমন কোনও নৈর্ব্যক্তিক মানদণ্ড নেই যাতে এদের মধ্যে গুণমানের (ব্যক্তিগত পছন্দের নয়) তুলনা করা যায়। 

কিন্তু, একই সঙ্গে এই কথাটাও বলে রাখা যাক যে, আমরা মনে করি না যে সব সংস্কৃতি গুণগত ভাবে তুল্যমূল্য। অর্থাৎ, নাগরিক সমাজেই হোক বা লোকসমাজে, যেকোনো নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক ঘরানার মধ্যে যদি একটা অংশকে যদি উচ্চমার্গের সংস্কৃতি বলে চিহ্নিত করতে হয়,  অন্য একটা অংশকে প্রাকৃত সংস্কৃতি বলেও চিহ্নিত করতে হবে। সেই শ্রেণিবিভাগের মাপকাঠি কী হবে? এই প্রশ্নটার একটা উত্তর হতে পারে এই রকম এক, যদি কোনও সংস্কৃতি অর্জন করতে  খানিকটা পরিশ্রম বা চর্চা বা সাধনা করতে হয়; দুই, যদি এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মেসেই সংস্কৃতিকে বহমান করার তাগিদ থাকে; এবং তিন, সেই সংস্কৃতি যদি  সেই গোষ্ঠীর বাইরে থেকে এসে কেউ যথাযথ চর্চা করেন তার উৎকর্ষ উপলব্ধি করবেন তবে সেই সংস্কৃতিকে আমরা উৎকর্ষের বিচারে উচ্চমার্গের সংস্কৃতি হিসেবে গণ্য করব। এই লেখায় বহু বার উচ্চমার্গের সংস্কৃতি বা কাছাকাছি গোত্রের শব্দ ব্যবহৃত হবে।যদিও আগের অনুচ্ছেদেই আমরা স্বীকার করেছি যে আমাদের উদাহরণ চয়নের মধ্যে একটা পক্ষপাতআছে, কিন্তু আরও এক বার মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন: আমরামনে করি না যে আমাদের ব্যবহৃত উদাহরণগুলিই উচ্চমার্গের সংস্কৃতির একমাত্র উদাহরণ। এইখানে উচ্চমার্গের সংস্কৃতির যে সংজ্ঞা আমরা নির্ধারণ করলাম, গোটা লেখায় সেই সংজ্ঞা অনুসারেই শব্দটিকে বুঝতে হবে। 

এই বারে প্রশ্নএই সংস্কৃতিনামক বস্তুটাকে কি রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করা যায়? বিভেদমূলক হিংসাত্মক রাজনীতির বিরুদ্ধে কি গড়ে তোলা যায় এক অদৃশ্য দেয়াল? বাংলা ভাষায় লিখে এই প্রশ্নটা উত্থাপন করলে ইতিহাস অট্টহাস্য করে উঠতে পারে। বাংলাই তো সেই ভাষা, যা একটা নয়, দুটো ভাষা আন্দোলনের জন্ম দিয়েছিল। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে, আর অসমে। সেই ভাষা আজ রাজনৈতিক প্রতিরোধের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারবে না? এ ক্ষেত্রে মনে করিয়ে দেওয়া জরুরি, পূর্ব পাকিস্তান বা অসম, উভয় ক্ষেত্রেই কিন্তু প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল রাষ্ট্রশক্তি ভিন্ন ভাষাকে বঙ্গভাষী জনগোষ্ঠীর উপর চাপিয়ে দিতে চাওয়ায়, বাংলা ভাষাকে তার প্রাপ্য গুরুত্বটুকুও না দিতে চাওয়ায়। ভবিষ্যতে কী হবে তা বলা যায় না, কিন্তু বর্তমানে এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, পূর্ব পাকিস্তানে যে ভাবে উর্দু চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছিল, পশ্চিমবঙ্গে হিন্দি আগ্রাসন সে তুলনায় কিছুই নয়। এবং, এখনও হিন্দির পিছনে যে রাষ্ট্রীয় মদত, তা প্রচ্ছন্ন। তাতে দখলদারি বিলক্ষণ আছে, কিন্তু এখনও একাধিপত্য নেই। ফলে, ভাষার বিপন্নতা দিয়ে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে আবেগের সূত্রে বাঁধার অবকাশ পশ্চিমবঙ্গে এখনও নেই।

ফলে, ভাষা বা সংস্কৃতিকে যদি প্রতিরোধের অস্ত্র হয়ে উঠতে হয়, তা হতে হবে ভাষা বা সংস্কৃতির প্রতি গর্বের জায়গা থেকে, অথবা তার ব্যবহারিক উপযোগিতার কারণে। এই প্রশ্নের উত্তর যে যাঁর মতো করে খুঁজতে পারেন, অবশ্যই। আমরা যেহেতু পেশাগত দিক থেকেএক জন প্রত্যক্ষভাবে, আর অন্য জন খানিক ঘুরপথেঅর্থনীতির চর্চা করি, তাই আমরা এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজব অর্থশাস্ত্রের চৌহদ্দিতে। এখানে গোড়াতেই একটা আপত্তি উঠতে পারেসংস্কৃতির মতো বিষয়ের সঙ্গে কি অর্থনীতির সম্পর্ক তেল আর জলের নয়? এই দুটো জিনিস আদৌ মিশ খায়? ভ্যান গঘ থেকে ঋত্বিক ঘটক, সাদাত হোসেন মান্টো থেকে জীবনানন্দ দাশকে আর কবে বাজারের তোয়াক্কা করে শিল্প তৈরি করেছেন? ক্রেডিট কার্ডের বিজ্ঞাপনের ভাষা ধার করে বরং বলা যায়, কিছু কিছু জিনিস আছে, টাকা দিয়ে যা কেনা যায় নাসংস্কৃতি তো সে রকমই একটা জিনিস। তা হলে, সংস্কৃতির অলৌকিক প্রশ্নটাকে অর্থশাস্ত্রের লৌকিক পরিসরে এনে ফেলা কেন? এই প্রশ্নটার উত্তর লেখার শুরুতেই দিয়ে দেওয়া যেত। কিন্তু, আমাদের আশা, এই লেখা ধাপে ধাপে যে ভাবে এগোবে, তাতে নিজে থেকেই স্পষ্ট হয়ে যাবে, কেন সংস্কৃতির প্রশ্নটাকে অর্থশাস্ত্রের তাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যে দিয়ে দেখা জরুরি।

সংস্কৃতির অন্য উপাদানগুলোর কথায় আসার আগে গোড়ায় ভাষার প্রশ্নটাকে তোলা যাক। বাংলা ভাষা নিয়ে গর্বের প্রশ্নহিন্দির আগ্রাসন সম্বন্ধে সচেতন হওয়ার জন্য, তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিরোধ তৈরি করার জন্য নিজের ভাষা নিয়ে যে গর্বটা থাকা একেবারে জরুরি শর্ত। ধরে নিতেই পারি, মাতৃভাষা নিয়ে প্রত্যেক বাঙালির গর্ব আছে। কার গর্বের পরিমাণ কতখানি, সেই বিচারে যাওয়ার প্রয়োজন নেইআপাতত ধরে নেওয়া যায় যে, কারও সঙ্গে কারও গর্বের পরিমাণের তুলনা করা যায় না। কিন্তু, সেই গর্বটা তাঁদের ব্যক্তিগত বনাম ব্যবহারিক জীবনযাত্রাকে কতটা প্রভাবিত করছে, সেটা দেখা যেতে পারে। এখানে পরিষ্কার করে নেওয়া ভাল যে, নিজের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি ভালবাসা মানেই অন্য ভাষা বা সংস্কৃতির বিরোধিতা করা নয়। এখানেও সমন্বয় আর বিরোধিতা এই দুটি মডেল আছে— “নিজের রাজ্যে দাঁড়িয়ে কারও সঙ্গে হিন্দিতে কথা বলব না”, এই অবস্থানটা যাঁরা নেন তাঁরা মাতৃভাষার প্রতি গর্ববোধ থেকেই গ্রহণ করেন, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। এখন নিকটবর্তী রাজ্য থেকে সদ্য  আসা এক জন দরিদ্র শ্রমিক, যিনি হিন্দি ছাড়া অন্য কোনও ভাষা জানেন না, তাঁর ক্ষেত্রে এটার প্রয়োগ আর যাঁরা সুযোগ সত্ত্বেও বাংলা শেখা বা বলার বা বাংলা ভাষার প্রতি সম্মান দেখানোর (যেমন দোকানের বা পথনির্দেশের সাইনবোর্ডে  আদৌ বাংলা না থাকা, বা যিনি বাংলা ছাড়া অন্য কোনও ভাষা জানেন না, তাঁর সাথে হিন্দি বা ইংরেজিতে কথা বলা) তাঁদের ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা ব্যবহার করা হোক, এটা চাওয়ার মধ্যে একটা বড় তফাত আছে।  নিজেদের কথা বলতে গেলে বলব যে, আমরা উগ্র প্রাদেশিকতা বা আমরা বাঙালিগোছের মানসিকতা কখনও সমর্থন করি না। আমাদের কাছে বাঙালিয়ানার একটা বড় দিক হল পরকে আপন করার অন্তর্ভুক্তিমূলক মানসিকতা, আপনকে পর করার বিভেদমূলক মানসিকতার ঠিক যা বিপরীত।  এবং সাংস্কৃতিক বলয়ে ব্যক্তিস্বাধীনতার উপর খুব বেশি হাত চালানোর পক্ষপাতী নইকিন্তু বাংলা ভাষার চর্চা ও ব্যবহার যে কিছু কিছু পরিসরে অনভিপ্রেত ভাবে সরে যাচ্ছে, এবং তা নিয়ে কিছু করা আমাদের কাছে পরিবেশরক্ষার মতোই গুরুত্বপূর্ণ। 

আমাদের অবস্থানটা পরিষ্কার করে এ বার আসি একটা অন্য প্রশ্নেবাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে এই গর্ব করার ক্ষমতাটা কি মানুষের আর্থিক অবস্থানের সঙ্গে এক সুতোয় বাঁধা নয়? রাজ্য থেকে যত মানুষ ভিন্ রাজ্যে দক্ষ, অর্ধদক্ষ বা অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে যান, তাঁদের কাছে হিন্দিতে কথা বলতে পারা কি একটা বাড়তি যোগ্যতা নয়, যার মাধ্যমে তাঁরা আর একটু ভাল জীবনযাপনের স্বপ্ন দেখতে পারেন? তেমন মানুষরা কি মাতৃভাষার গর্বে গর্বিত হয়ে পশ্চিমবঙ্গে হিন্দি বয়কট করার ডাকে সাড়া দেবেন? কেউ বলতেই পারেন, এই ধরনের মানুষের কাছে হিন্দি বলতে পারা এক অর্থে একটা অ্যাসপিরেশন। যাঁরা সুবিধাজনক সামাজিক অবস্থানের কারণে শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জনের ফলে ইংরেজিতে স্বচ্ছন্দ, এবং বাংলা-ইংরেজির দ্বিভাষিক পরিমণ্ডল থেকেই জীবিকানির্বাহ করতে সক্ষম, তাঁদের পক্ষে এই অ্যাসপিরেশন বা উচ্চাকাঙ্ক্ষার মর্ম উপলব্ধি করা কঠিন।

অর্থাৎ, ভাষার মতো সংস্কৃতির একেবারে প্রাথমিক উপাদানটির ক্ষেত্রেও জড়িয়ে যাচ্ছে অর্থনীতির প্রশ্ন। এই প্রশ্নটাকেই আমরা একটু অন্য ভাবে পেশ করতে পারি। খোঁজ করতে পারি: ভাষা, বা বৃহত্তর অর্থে অবসরবিনোদনের জন্যে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে যে নানা  পণ্য আছে (যার মধ্যে সাহিত্য, সংগীত, চলচ্চিত্র, কলা ও  কারুশিল্প, যাত্রা-নাটক সবই ধরা যেতে পারে) সেগুলি কি এক ধরনের লাক্সারি গুড বা বিলাসপণ্য? এখানে নৃতত্ত্বের ভাষায় সংস্কৃতিকে জীবনধারণের নানা আচার এই অর্থে নয়, খানিকটা সংকীৰ্ণ অর্থে অবসর ও বিনোদনমূলক নানা  কর্মকান্ডের অর্থে বোঝাতে চাইছি। অর্থশাস্ত্রে লাক্সারি গুড-এর সংজ্ঞা এই রকম: মানুষের আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আপেক্ষিক ভাবে যে যে পণ্য, সেবা, ও পরিষেবার চাহিদা বাড়ে, অতএব উপভোগও বাড়ে, তাকেই বলে লাক্সারি গুড। বলে রাখা ভাল যে, বিলাসপণ্য মানে বিলাসকরার উপকরণ নয়যা-ই আবশ্যক নয়, অর্থশাস্ত্রের সংজ্ঞায় তাকেই বিলাসপণ্য ধরা হয়। সচ্ছলতার সঙ্গে সঙ্গে আপেক্ষিক ভাবে আবশ্যক পণ্যের চাহিদা কমে, আর বিলাসপণ্যের চাহিদা বাড়ে। আমরা এই ক্ষেত্রে জানতে চাই যে, সংস্কৃতি কি এমন একটা পণ্য, মানুষের আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যার চাহিদা বাড়ে; বা মানুষ যখন একটা সীমার নীচে আয় করে, তখন তার সংস্কৃতি উপভোগ করার সাধ্য থাকে না? সংস্কৃতি বা ভাষাকে যদি রাজনৈতিক প্রতিরোধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে হয়, তা হলে জানা প্রয়োজন যে, জনসাধারণের কত অংশের পক্ষে সেই অস্ত্র ব্যবহার কর সম্ভবকত শতাংশ অস্ত্রটি ব্যবহার করার মতো জায়গায় আছেন, এবং কত শতাংশের কাছে অস্ত্রটির আদৌ কোনও তাৎপর্য আছে। সেই কারণেই বোঝা প্রয়োজন, ভাষা বা সংস্কৃতি অর্থনৈতিক পণ্য’  হিসেবে ঠিক কোন চরিত্রের।

এই ক্ষেত্রে আরও একটা কথা স্পষ্ট করে নেওয়া ভাল— ‘সংস্কৃতিবলতে অনেক সময়েই হাই কালচারবাউচ্চমার্গের সংস্কৃতি’-কে বোঝানো হয়। শিক্ষিত ও সংস্কৃতিবান মহলে বাংলা ভাষার প্রতি মমত্ব এবং বাংলাচর্চার আপাত- নিম্নমুখী ধারা নিয়ে আশংকা আশঙ্কা অবশ্যই সেই হাই কালচার’-এর অন্তর্গত। তবে শুধু তাই নয় -বাংলা ভাষার প্রতি মমতা এই বৃত্তের বাইরেও কিছু কম নয় । রাজ্যের বাইরে (দেশে বা বিদেশে) বাংলা বলতে শুনে অন্য বঙ্গভাষীদের আন্তরিক ও উষ্ণ ব্যবহার পাওয়ার বা অযাচিত ভাবে উদার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবার দেওয়ার অভিজ্ঞতা আমাদের অনেকেরই। তাঁরা অনেকেই সাংস্কৃতিক বা অর্থনৈতিক দিক থেকে উচ্চশ্রেণিীর মানুষ নন।  উচ্চমার্গের সংস্কৃতির কথা বললে অবধারিত ভাবে নিম্নমার্গের সংস্কৃতি, বা বিগত এক জমানার পরিভাষায় অপসংস্কৃতি'-র কথা উঠতে বাধ্য।  আমরা আমাদের বক্তব্যের দিক থেকে কোনটা উচ্চমার্গ, আর কোনটা নিম্নমার্গ, সেটা কী করে ঠিক হবে, এই সমস্যাজনক ব্যাপারটার মধ্যে বেশি ঢুকব োনা -বরং নিরপেক্ষ ভাবে, ভাষার শ্রেণিীবিভাগের মতো এদের মার্জিত (বা তৎসম ) আর প্রাকৃত, এই অর্থে ব্যবহার করব। 

আলোচনা যখন অর্থশাস্ত্রের চৌহদ্দিতে ঢুকেই পড়েছে, তখন চাহিদা আর জোগানের প্রসঙ্গে না ঢুকে উপায় নেই। কোনও অঞ্চলে, যেমন ধরা যাক পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে, উচ্চমার্গের সংস্কৃতি বস্তুটির চাহিদা আর জোগান কি নির্ভর করে সেই অঞ্চলের আর্থিক সমৃদ্ধির উপর?

যদি বাজারের পরিস্থিতির উপর নির্ভর করেই সেই পণ্যের জোগান নির্ধারিত হয়, তবে সন্দেহ নেই, তার কিছু নির্দিষ্ট শর্ত থাকবে। ভাল গুণমানের সিনেমা-থিয়েটার তৈরি করতে হলে তার একটি ফিক্সড কস্ট বা নির্দিষ্ট বাঁধা খরচ আছে। ভাল বই ছেপে বার করার জন্যও বাঁধা খরচ আছে, আবার যত ছাপা হবে, সেই অনুপাতে খরচও আছে। ভাল ছবি প্রদর্শনীর জন্য গ্যালারি প্রয়োজন, ভাল গান-বাজনার জন্য ভাল মানের প্রেক্ষাগৃহ, রেকর্ডিং স্টুডিয়ো ইত্যাদি প্রয়োজন। অর্থাৎ, উচ্চমার্গের সাংস্কৃতিক পণ্যের জোগানের জন্য অর্থ প্রয়োজন। তার জন্য বেশ কিছু অর্থবান ব্যক্তি প্রয়োজন, আবার বেশ কিছু গুণী ব্যক্তিও প্রয়োজন, যাঁরা অন্য কোনও পেশায় না গিয়ে সাংস্কৃতিক পণ্য নির্মাণের কাজটি করবেন। উচ্চমার্গের সাংস্কৃতিক পণ্য নির্মাণের ক্ষেত্রে নেটওয়ার্ক এক্সটার্নালিটিজ়-এর একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছেঅর্থাৎ, তেমন পণ্য তৈরির জন্য তুলনায় অনেক বেশি সংখ্যক গুণী মানুষের প্রয়োজন হয়। কিছু মাঝারি মেধার লোক জোগাড় করতে পারলেই একটি টিভি সিরিয়াল তৈরি করে ফেলা যায়, কিন্তু ভাল মানের নাটক তৈরি করার জন্য উৎকৃষ্ট মেধার প্রয়োজন পড়ে।

চাহিদার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কেমন? লেখার শুরুতে হিন্দির বিরুদ্ধে বাংলা ভাষা ব্যবহারের চাহিদার ক্ষেত্রে আমরা উল্লেখ করেছিলাম যে, জীবিকার কারণে যাঁরা হিন্দির উপর নির্ভরশীল, তাঁদের পক্ষে মাতৃভাষার প্রতি গর্বকে তার ব্যবহারের চাহিদায় রূপান্তরিত করা কঠিন। এই কথাটাই একটু বৃহত্তর অর্থে যাবতীয় উচ্চমার্গের সাংস্কৃতিক চাহিদার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয় কি? একটা ন্যূনতম আর্থিক সচ্ছলতা না থাকলে, সংস্কৃতির পিছনে সময় বা অর্থ ব্যয় করার মানে হল, বেঁচে থাকার অন্য কোনও জরুরি উপাদানের জন্য সময় বা অর্থ কম ব্যয় করতে পারা। কথাটা সবার ক্ষেত্রেই সত্যি -শ্রম ও অবসরের মধ্যে সময়ের বণ্টন  (যাকে পরিভাষায়  লেবার-লিজ়ার ট্রেড অফবলে) অর্থশাস্ত্রের একেবারে মৌলিক বিষয়গুলোর একটা। বস্তুত, কার্ল মার্ক্স কমিউনিজম-এর সর্বোচ্চ স্তরের ছবি আঁকার ক্ষেত্রে যে কল্পনাটি ব্যবহার করেছিলেন, তার মূল কথা ছিল বৈষম্যমূলক সমাজব্যবস্থায় আরোপিত শ্রমের বিভাজন এবং আর্থিক অনটনের দায়ে শ্রম ও অবসরের মধ্যে পছন্দসই ভারসাম্য বেছে নেবার বিলাসিতা থাকেনা । কমিউনিস্ট ব্যবস্থায় এই টানাপোড়েন থেকে উত্তীর্ণ হয়ে মানুষ সকালে শিকার, বিকেলে মাছ ধরা, সন্ধেবেলা শিল্প সমালোচনা  করতে পারবে, এবং এদের মধ্যে কোন দ্বন্দ্ব থাকবেনা অর্থাৎ অবসর যাপনের সময়ে রুজিরুটিতে টান পড়ার কথা ভাবতে হবে না। কিন্তু, সে বাস্তব এক ভিন্ন সাধনার ফল। আমরা যে দুনিয়ায় থাকি, সেখানে কিন্তু, অর্থনৈতিক ভাবে একটি সীমারেখার নীচে থাকা মানুষের কাছে উচ্চমার্গের সংস্কৃতিকে বেছে নেওয়ার অর্থ, সটান রুজিরুটিতে টান পড়া। অর্থাৎ, আয় একটি ন্যূনতম স্তরে না পৌঁছলে উচ্চমার্গের সাংস্কৃতিক পণ্যের চাহিদা তৈরি হয় না। কাজেই, একে বিলাসপণ্য না বলে উপায় নেই।

চাহিদা আর জোগানের অঙ্কটাকে এক সঙ্গে দেখলে উচ্চমার্গের সাংস্কৃতিক পণ্যের বাজারের ছবিটা কেমন হবে? যত ক্ষণ না জনসংখ্যার একটা বড় মাপের হাতে যথেষ্ট আয়ের সংস্থান হবে, তত ক্ষণ অবধি উচ্চমার্গের সাংস্কৃতিক পণ্যের চাহিদা তৈরি হবে না। এবং, চাহিদা না থাকার কারণে যথেষ্ট জোগানের পরিস্থিতিও তৈরি হবে না। তার ফলে সাংস্কৃতিক পণ্যের বাজারে যা তৈরি হবে, তা হবে জনপ্রিয় কিন্তু প্রাকৃত শ্রেণিীর । অর্থাৎ, টুনির মা, টুম্পাসোনা, অথবা বেদের মেয়ে জোসনা। অনেকে এই ধরণের ধরনের সাংস্কৃতিক পণ্যের ভোক্তা হবার হওয়ার জন্যে লাভ অর্জন করতে দাম বেশি ধার্য করার দরকার হবে না। তাই এই পণ্য উপভোগ করার ব্যয়ও কম, ফলে আর্থিক ভাবে অসচ্ছল হলেও তার চাহিদা থাকে।

প্রশ্ন হল, মানুষের আয় বাড়লেই কি প্রাকৃত সাংস্কৃতিক পণ্যের চাহিদা কমে আর মার্জিত সাংস্কৃতিক পণ্যের চাহিদা বাড়ে ? প্রশ্নটা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মানুষের হাটে হাতে সময় যেহেতু সীমিত, তাই একটার চাহিদা বাড়লে অন্যটার চাহিদা কমবে। ফলে, আয় বাড়লে উচ্চমার্গের সংস্কৃতির চাহিদা বাড়বে কি না, এই প্রশ্নের জবাব অনেকাংশে নির্ভর করছে আয় বাড়লে প্রাকৃত সংস্কৃতির চাহিদা কমে কি না, তার উপর। অর্থাৎ, প্রাকৃত সংস্কৃতি কি শস্তার সস্তার জিনিসের মতো অর্থনীতির ভাষায় ইনফিরিয়র গুড বা নিকৃষ্ট পণ্যউপভোক্তার আয় বাড়লে যে পণ্যের চাহিদা কমে? ঘটনা হল, আয় বাড়লে যেমন বিড়িসেবী মানুষ সাধারণত সিগারেট খেতে আরম্ভ করেন, বা বাংলা মদ্যের উপভোক্তা হয়ে ওঠেন স্কচ হুইস্কির রসিক, প্রাকৃত সংস্কৃতির ক্ষেত্রে তেমন কথা বলা মুশকিল। যিনি আশৈশব প্রেম জেগেছে আমার মনে বলছি আমি তাইশুনে যুবক হয়েছেন, আয় বাড়লেই তিনি প্রেম এসেছিল নিঃশব্দচরণেশুনতে আরম্ভ করবেনঅভিজ্ঞতা বলে, ছবিটা ঠিক সে রকম নয়। সংস্কৃতি চরিত্রে আঠালোলাগলে পরে ছাড়ে না!

তবে, ক্ষেত্রবিশেষে ছাড়েও বটে। উচ্চমার্গের সংস্কৃতির একটা সঙ্গপ্রভাব (যাকে পরিভাষায় পিয়ার এফেক্ট বলে) থাকতে পারেঅর্থাৎ, অবস্থার উন্নতির ফলে আমি যে আর্থ-সামাজিক শ্রেণিতে প্রবেশ করেছি, সেই শ্রেণিতে অন্যদের মধ্যে যদি উচ্চমার্গের সংস্কৃতির চাহিদা থাকে, তবে নিজেকে সেই শ্রেণির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে আমার মধ্যেও উচ্চমার্গের সংস্কৃতির চাহিদা তৈরি হতে পারে। এটা আরও বেশি প্রকট হয় পরবর্তী প্রজন্মের ক্ষেত্রে। অর্থাৎ, নতুন আর্থ-সামাজিক শ্রেণিতে যদি উচ্চমার্গের সংস্কৃতির চাহিদা থাকে, তবে আমি নিজের সন্তানের মধ্যে সেই সংস্কৃতির প্রতি আসক্তি তৈরিতে সচেষ্ট হব, যাতে সে এই শ্রেণিতে আরও স্বাভাবিক ভাবে মিশতে পারে।

অর্থাৎ, সামগ্রিক ভাবে উচ্চমার্গের সংস্কৃতির প্রতি চাহিদার জন্য উপভোক্তার আর্থিক সচ্ছলতা থাকাটা জরুরি শর্ত, কিন্তু যথেষ্ট শর্ত নয়। অন্য ভাষায় বললে, উচ্চমার্গের সংস্কৃতির জন্য চাহিদা তৈরি হতে গেলে অর্থনীতিতে সামগ্রিক ভাবে উপভোক্তাদের আর্থিক অবস্থা সচ্ছল হতে হবেকিন্তু, সামগ্রিক ভাবে আর্থিক সচ্ছলতা থাকলেই যে উচ্চমার্গের সংস্কৃতির চাহিদা তৈরি হবে, এমন কোনও কথা নেই। তার জন্য প্রয়োজন একটা অন্য জিনিসেরআর্থিক সমৃদ্ধির সঙ্গে উচ্চমার্গের সংস্কৃতির একটা যোগসূত্র থাকতে হবে।  অর্থাৎ, কোনও একটি সমাজের অর্থনৈতিক চরিত্র যদি এমন হয় যে, তার আর্থিক সমৃদ্ধির সঙ্গে উচ্চ সংস্কৃতি প্রত্যক্ষ ভাবে জড়িতকেউ আর্থিক ভাবে, লৌকিক ভাবে সফল হতে চাইলে তৎসম সংস্কৃতিতে অংশ না নিয়ে তার কোনও উপায় থাকবে নাতা হলে সেই সমাজে আর্থিক সচ্ছলতার জরুরি শর্ত হবে তৎসম সংস্কৃতিতে অধিকার। তেমন সমাজে আর্থিক সমৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গেই তৎসম সংস্কৃতির চাহিদা বাড়বে। তেমন একটা গোটা সমাজের কথা কল্পনা যদি না-ও করা যায়, দুটো পেশাকে পাশাপাশি রেখে ভাবলে হয়তো ছবিটা বুঝতে খানিক সুবিধা হবে। গ্রুপ থিয়েটারে এক জন নাট্যকর্মীকে যদি তাঁর পেশার শীর্ষ পৌঁছোতে হয়, তবে তাঁকে তৎসম সংস্কৃতিতে সড়গড় হতেই হবেনচেৎ তাঁর সামাজিক মূলধনই গড়ে উঠবে না। কিন্তু কেউ যদি প্রোমোটিং পেশার শীর্ষে পৌঁছোতে চান, তাঁর সামাজিক মূলধনের সঙ্গে রবীন্দ্রসাহিত্য বা অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাটক বা উস্তাদ আবদুল করিম খাঁর যমুনা কি তীর’-এর সম্পর্ক নেইএই বিষয়গুলিতে বিন্দুমাত্র অধিকারী না হয়েও তিনি তাঁর পেশার, এবং আর্থিক সমৃদ্ধির শীর্ষ উঠতে পারেন। ব্যক্তিবিশেষের উদাহরণকে যদি সমাজের স্তরে নিয়ে এসে দেখা যায়, তা হলে আর্থিক সমৃদ্ধি ও উচ্চমার্গের সংস্কৃতির সম্পর্কটি বোঝা সম্ভব।

অথবা, ভাষা বা সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে যদি এমন কোনও খণ্ডজাতীয়তাবাদের জন্ম হয়, যেখানে এই ভাষাগত পরিচিতি হয়ে উঠতে পারে উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক সহযোগিতার যোগসূত্র, তা হলেও সংস্কৃতি আর আর্থিক সমৃদ্ধির মধ্যে এক ধরনের সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে। একটা কাল্পনিক উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরুন, পশ্চিমবঙ্গের পরিসরে এমন একটা ভাষাভিত্তিক খণ্ডজাতীয়তাবাদের জন্ম হল, যেখানে বাঙালি শুধুমাত্র বাঙালির সঙ্গেই ব্যবসায়িক আদানপ্রদান করবে, শুধুমাত্র বাঙালিকেই চাকরি দেবে। এখানে স্পষ্ট ভাবে বলা প্রয়োজন, এমন কোনও খণ্ডজাতীয়তাবাদের প্রতি আমাদের নৈতিক সমর্থন নেইযে কোনও পরিচিতির ভিত্তিকেই কাউকে কোনও ব্যবস্থা থেকে বাদ দেওয়াকে, অথবা কাউকে কোনও বাড়তি সুবিধা পাইয়ে দেওয়াকে আমরা অন্যায় বলে মনে করি। এবং, এই ধরনের ব্যবস্থা যে আর্থিক ভাবে কুশলী হতে পারে না, সে কথাও নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়। কিন্তু, কঠোর ভাবে কাউকে বাদ দেওয়া যদি না-ও হয়, শুধু বাঙালি পরিচিতির কারণে কিছু বাড়তি সুবিধা দেওয়া হয়, তবে  বাঙালি পরিচয়টিকে লালন করার সঙ্গেবাংলা ভাষা, সংস্কৃতির প্রতি যত্নবান হওয়ার সঙ্গেআর্থিক সমৃদ্ধির যোগসূত্র প্রতিষ্ঠিত হবে।

লেখার শুরুতে যে প্রশ্নটা ছিল, তাতে ফিরে যাইভাষা বা সংস্কৃতি কি রাজনৈতিক প্রতিরোধের অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে? লেখায় যে সম্ভাবনাগুলো আলোচনা করলাম, তা এই রকমএক, যদি রাষ্ট্রক্ষমতা জোরজবরদস্তি অন্য কোনও ভাষা চাপিয়ে দিতে চায়, তা হলে ভাষা প্রতিরোধের অস্ত্র হতে পারে; এবং দুই, যদি ভাষা বা সংস্কৃতির প্রতি যথেষ্ট চাহিদা থাকে, তা হলেও অন্য কোনও ভাষা বা সংস্কৃতির সামাজিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব। আমাদের আলোচনা গড়িয়েছে মূলত দ্বিতীয় সম্ভাবনার খাতেই। আমরা দেখেছি, ভাষা বা সংস্কৃতিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার উপায় বাংলাভাষী বহু মানুষেরই নেই। কিন্তু, এত ক্ষণ যে প্রশ্নটাকে চেপে ধরা হয়নি, তা এই রকম: ভাষা বা সংস্কৃতিকে যে অবাঙালিআগ্রাসনের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যায়, বা তা করা প্রয়োজন, এই কথাটা অনুভব করেন কত জন? পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান পরিস্থিতির কথা মাথায় রাখলে স্বীকার করতেই হয়, খুব বেশি মানুষ সেই প্রয়োজন অনুভব করেন না।

কেন, সেই উত্তরের একটা আভাসমাত্র এই লেখায় থাকুক। স্বাধীনতার আগে থেকেই হরেক কারণে বাংলা ভাষার সঙ্গে, বাংলার সংস্কৃতির সঙ্গে অর্থনীতির যোগসূত্র ক্ষীণতর হয়েছে। বাংলার অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ চলে গিয়েছে ভিন ভাষাভাষীদের হাতে। এবং, অর্থনীতি আর সংস্কৃতি চলেছে দুটি ভিন্ন রুটের রেললাইনের মতোএকটার সঙ্গে অন্যটার কোনও যোগসূত্র নেই। মূলত যে দ্বিভাষী, প্রকৃত অর্থেই বিশ্বনাগরিক বাঙালি নিজেদের অধিকার কায়েম করেছে বঙ্গসংস্কৃতির উপর, বঙ্গ অর্থনীতির কলকবজার সঙ্গে তাদের দূরত্ব বিপুল। অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্কহীন উচ্চ সংস্কৃতি ক্রমশ সাধারণ মানুষের আরও দূরবর্তী হয়েছে।

এই দূরত্ব ঘোচানোর চেষ্টা এলিট বঙ্গকূল বহু কাল করেনি। উচ্চ প্রেক্ষাগৃহ থেকে সংস্কৃতিকে কারখানার গেটে, আর হাটবারের মাঠে নিয়ে যেতে আগ্রহ দেখায়নি। বরং, প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের গান বা ঋতুপর্ণ ঘোষের ছবি যে রামা কৈবর্ত আর হাসিম শেখের জন্য নয়, এটা ভেবে আত্মপ্রসাদ অনুভব করেছে। রবীন্দ্রনাথ স্বদেশি আন্দোলনের সময় মুসলমানদের তুলনায় দূরে সরে থাকা নিয়ে কালান্তর-এ যা লিখেছিলেন, এই মুহূর্তে সংস্কৃতিমান এলিট বাঙালিআর প্রাকৃত বাঙালির দ্বিত্ব সম্বন্ধেও সেই একই কথা বলা চলেএত দিন যাদের দূরে সরিয়ে রেখেছি, আজ সঙ্কটের কালে তাদের ভাই বলে ডাকলেই চলবে না। উল্টোটাও হয়নি। কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর আন্তরিক প্রচেষ্টা (যেমন, লোকসংগীতের ক্ষেত্রে মাদল বলে দলটি) সত্ত্বেও সাধারণ নাগরিক শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজে লোকসংস্কৃতির যে সমৃদ্ধ ধারা তার থেকে দূরে সরে থেকেছে । এখন দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়াবলে আর কী হবে। 

সংস্কৃতিমান বাঙালিআপাতত স্বখাতসলিলে নিমজ্জমান।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার: এই লেখাটির প্রথম খসড়া পড়ে মনীষিতা  দাশের অভিমত আমাদের বক্তব্যকে আরও স্পষ্ট করতে সাহায্য করেছে। 

 

Tuesday, April 13, 2021

নির্দিষ্ট কিছু সূচকের নিরিখে পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির গত দুই দশকের সারা দেশের সাথে তুলনামূলক চিত্র

পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির গত দুই দশকের আপেক্ষিক চিত্র, সারা দেশের সাথে নির্দিষ্ট কিছু সূচকের নিরিখে। আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত, https://www.anandabazar.com/editorial/essays/purchasing-power-in-rural-bengal-is-increasing/cid/1275791 (এপ্রিল ১৪, ২০২১ )।

বিশ্লেষণের ফলাফলের সারসংক্ষেপ হল:

আমরা যদি মাথাপিছু জাতীয় আয়ের গড় বার্ষিক বৃদ্ধির হার দেখি, তা হলে দেখব যে, নব্বইয়ের দশকে রাজ্যের বৃদ্ধির হার দেশের গড় বৃদ্ধির হারের চেয়ে বেশি ছিল। কিন্তু তার পরের দুই দশকেই রাজ্যের বৃদ্ধির হার দেশের গড় বৃদ্ধির হারের তুলনায় কম— অর্থাৎ, তুলনামূলক ভাবে পশ্চিমবঙ্গ সারা দেশের চেয়ে পিছিয়ে পড়েছে। শুধু তাই নয়, গত এক দশকে রাজ্যের আপেক্ষিক বৃদ্ধির হার দেশের তুলনায় এবং তার আগের দুই দশকের তুলনায় কমেছে। কিন্তু, একই সঙ্গে লক্ষণীয় যে, দেশের সার্বিক বৃদ্ধির হারও এই দশকে তার আগের দশকের তুলনায় কমেছে।

গত এক দশকে তার আগের দশকের তুলনায় পরিবর্তনের খুব একটা উল্লেখযোগ্য প্রমাণ নেই, একটি ব্যতিক্রম ছাড়া— গ্রামাঞ্চলে মাথাপিছু পারিবারিক ব্যয় বৃদ্ধির হার এই রাজ্যেরই আগের দশকের এবং গত এক দশকে দেশের গড়পড়তা বৃদ্ধির হারের চেয়ে বেশি। এর পিছনে সরকারের নানা অনুদানমূলক প্রকল্পের (কন্যাশ্রী, কৃষক বন্ধু, যুবশ্রী ইত্যাদি) ভূমিকা থাকা সম্ভব। একই সঙ্গে আয়ের বৃদ্ধিতে রাজ্যের পরিস্থিতি গত দুই দশকে খুব একটা পাল্টায়নি, এবং সারা দেশের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গ খানিকটা পিছিয়ে আছে। এর প্রভাব কর্মসংস্থানের উপর পড়তে বাধ্য। তাই উন্নয়নের বদলে খয়রাতির রাজনীতি বলে যে সমালোচনা শোনা যায়, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন নয়। এও লক্ষণীয় যে উন্নতির যে কটা নিরিখ ব্যবহার করেছি সেই অনুযায়ী কিন্তু বাম আমলে আপেক্ষিক ফলাফল কিছু খারাপ নয়, শুধু এটা বাদ দিলে। অথচ বাম জমানার প্রথম দশকে গ্রামাঞ্চলে উন্নতি হয়েছিল সবচেয়ে বেশি।

তাই, শুধু যদি অর্থনৈতিক মাপকাঠিতে বিচার করি, তা হলে রাজ্যের অবস্থা এই জমানায় বা তার আগের জমানায় যা-ই হয়ে থাকুক না কেন— গত সাত বছরে কেন্দ্রে বিজেপি সরকারের অর্থনৈতিক রেকর্ডের ভিত্তিতে সে দলের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মডেলের উপর ভরসা করা মুশকিল। কোভিড-১৯ সঙ্কট শুরু হওয়ার আগের কয়েক বছর থেকেই মোদী জমানায় সারা দেশের সার্বিক বৃদ্ধির হার ক্রমহ্রাসমান এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে দারিদ্র হ্রাস তো দূরের কথা, নানা সূত্র থেকে সঙ্কটের চিহ্ন অনস্বীকার্য।

Monday, April 12, 2021

Songs of Leisure, Jeebananda Das


The world seems like a magic land by the mystic river

All the fading sunlight gathering in after the end of the day's work

And songs of somnolence drifting in from the sea of summer

Songs of Leisure, Jeebananda Das

My translation of:

পৃথিবীরে মায়াবীর নদীর পারের দেশ ব’লে মনে হয়;
সকল পড়ন্ত রোদ চারিদিকে ছুটি পেয়ে জমিতেছে এইখানে এসে,
গ্রীষ্মের সমুদ্র থেকে চোখের ঘুমের গান আসিতেছে ভেসে
অবসরের গান, জীবনানন্দ দাশ



Sunday, March 28, 2021

আমার প্রথম ও শেষ উপন্যাস সমালোচনা

পুরনো ফোল্ডারে একটা কাজের ফাইল খুঁজতে গিয়ে চোখে পড়ল অনেকদিন আগে আমার লেখা প্রথম ও শেষ উপন্যাস সমালোচনার কথা, আনন্দবাজার পত্রিকায় বেরিয়েছিল ২০০৩ সালের অক্টোবরের গোড়ার দিকে। পিডিএফ ফাইল-ও নেই, আর তখনও বাংলা ফন্টে লেখা চালু ছিলোনা, তাই লেখাটি বাংলা হলেও ইংরেজী অক্ষরে লেখা। আনন্দবাজারের পুরনো সংস্করণের পাতায় ফন্টের সমস্যা - তাই লিংক বার করেও ফন্টের জন্যে পড়া গেলোনা -

http://archives.anandabazar.com/archive/1031007/4pustak1.htm?fbclid=IwAR3_KmsWCkk44i3Y-tgqq_7p9CKe49ft30OuIhWw9iJeP9mKYT27ViVKrmU

মজা লাগলো এতদিন বাদে পড়ে (যদিও বলে রাখা ভালো খুব দিলদরিয়া নয় সমালোচনাটি) তাই শেয়ার করলাম....

Name ki ase jay
Review of The Namesake by Jhumpa Lahiri, Flamingo (An Imprint of Harper-Collings), 2003.
America-r garparta janapriya “sangsarik” upanyasgulir surur drishyati anek samay erakam hoy - chhutir din, boston er sahratali-r barir janlar kanche raktimabha maple gachher parash, batase hemant-er amej, grihenee rannay byasto, sandhebelay atithi-apyayan hobe, emon samay bina meghe bajrapat…Arthat eibar natokiyo kono ghatana ghatbe noyto tar khabar asbe telephone-e.
Rannar pod roasted chicken palte kore din chhingrir malaikari, charitra-der nam Barbara-John palte kore din Nandini-Amitabha ar ghatana-r jaygay madhyabayaska John-er parakiya prem-er gopan brittanto sahasa udghatan, ba, aro adhunik hote chaile, operation kore Jenny namnee naree hobar angikar ghoshana (ogo, tahole tomay ki bole dakbe amader chhele meyera…) palte kore din Nandini- Amithabha-er kanya Sarmila-r sahasa bidrohaghoshana je se ma-babar pacchandasoi prabasi bangali patrer sathe biyer sambhabanay alap korte raji noy motei, hriday sampechhe se kane dul pora lamba chul dhhulu dhhulu chokh parar baundule ek American chheler kachhe.
Nam parichay palte dileo boi-ti ki o deshe eki rakam janapriya hoto? Prabasi bangali-der bad dile sadharan American pathakra ki sagrohe porten ei kahini? Ei adbhut chinta-ti mathay elo Jhumpa Lahiri-r America-r patabhumikay ekti prabasi bangali paribar ke kendra kore lekha bahu pratikhhito natun upanyas parte parte.
Jhumpa boyese nabeen, kintu er madhyei ingreji bhashay je bharotio ba bharotio banghsadbhuto lekhakera deshe-bideshe nam korechhen tander sathe ek nihshashe uchharito hoy tanr nam. Jhumpa-r pratham boi chhoto galper sankalan Interpreter of Maladies prakash hobar pore markin deshe besh sara phelechhio, Pultizer Prize peyechhilo. Tanr dwito boi, adi-nibas Kolkata, adhuna boston-basee Ganguly paribar-er tin dashak ar dui prajanmer akhyan.
Purba-barnito kalpanik upanyasti je gotrer sahityer namuna, tar sathe sahityik guna-maner dik theke Jhumpar lekhar kono tulana hoyna. Kintu sei prasange purbe uththapito prashnati-r mato eki dharaner ekti prashna mathay ghurte thake tanr alochito upanyasti poreo. Ghatanabali ek rekhe ba kinchit adalbadal kore charitra guli jadi americay prabasi bangali na hoye americay prabasi Italian ba Irish hoto, tahole kemon lagto boiti? Name ki satyi kichhu ase jay? Upanyastir madhye diye Bangali jeeban-er je chhabi phute othhe, tar prati prachyo-samparke swalpaparichay-prasuto romance-jarano koutuhol-i ki tane multicultarlism-e nabya-deekhkhito pashchatyer pathok-ke? Na ki jekono desh-er jekono kaler pathok-kei akrishto korbe abhibasee-der phele asa jeeban-er prati pichhutan, ar natun aparichito prithibee-te saphalyer o swachchhalatar amogh akorshon-er tanaporen-er chirantan manabik ei kahini?
Galper suru hochche kendriya charitra Gogol-er Boston sahare janma diye. Tar baba Ashok M.I.T. te engineering-e Ph.D. korchhen, ma Ashima grihabadhu. Dujonei baro hoye uthechhen Kolkatay. Santan-er daknam dewa holo Gogol. Nikolai Gogol sudhu je Ashok-er anyatama priya lekhak ta non, joubane ek bhayabaha train accident-e tini prane benche jan jatrapathe rat jege ei lekhaker chhoto galper sankalan porchhilen bole. Ashima-r Dida desh theke bhalo nam pachhanda kore pathaben chithite, se chithi ar asena, jana jay pakhkhaghate tini bodhshakti hariechhen. Shesh parjanta ekta bhalo nam bachha hoy bote, Nikhil, ja ekti parichito bangali nam, abar Nikolai-er sathe mil-o achhe, kintu ghatanachakre Gogol namei se parichito hoy ghare-baire.
Baro hoye uthte uthte tar nam niye Gogol-er mone chale nirantar tanaporen. Gogol nam ti tar bhalo lagena – eke adbhut nam, tay seta na American na Bharatiyo, tai sab jaygay parichay debar samay suru hoye jaye nam niye ek abadharito kathopokathon. Bideshe baro hoye otha, school-er ar panchta chhele-meyer theke alada hobar aswasti o nihsangata-r jantrana kendribhuto hoy tar nijer nam-tir prati bitrishnay. Sabalak hoe se adalat-e darkhasto kore Gogol nam-ti bisarjan dey, bairer prithibite parichito hoy sudhumatro Nikhil bole. Tar ma-baba ebong atmiya-bandhura abasya take Gogol namei dakte thaken. Ei pichhutan take aswasti-te rakhe. Jemon aswasti-te rakhe tar ma-babar samasta samajik jeeban sthanio bangali-samaj ke niye abortito howay, jar sathe se tar bairer prithibi-ke melate parena. Tander mon jeno pore achhe phele asa alok barsha dur ek grahe, ja koyek bachhar antar Kolkatay aganito atmiyaswajaner sathe dekha korte jabar jhatika saphar bad dile Gogol-er kachhe aparichayer andhare dhhaka.
Prabasi bangali matrei Ashoke o Ashima-r charitra gulike chinte parben, mil khunje paben nijeder ba parichitoder sathe. Desh theke chhatra hisebe ese apartment, department, advisor ar Budweiser (shesherti o deshe janapriya beer-er brand), chakri pele bari-gari-green card, sara saptaha aklanta parishram, ar saptahante sthanio bangali adda-r aborte kete jay jiban. Chhele meye-der bhalo swastha, sahebder mato uchcharone ingreji balate garbo hoy, kintu bhalo kore bangla na bolte para, desher, atmiya-swajaner, nija-sanskritir sathe jogajog-er abhabjanito sikarheentoay jage ashonka.
Jai hok, Gogol school shesh kore, college-e bharti hoy, sthir kore se sthapati hobe. Ar panchti saphal prabasi bangali chhele meye-r mato tar jeeban-o khub-i gatanugatik, sabcheye ullekhjogya ghatana guli holo baro hoye othar sathe sathe ekadhik prem o bichchhed. Kintu baba-r akosmik mrityu take thhele dey je atmanusandhan-er pathe, sei dirgha pakdandi-r sheshe se khunje pay tar jeeban-byapi tanaporen theke uttaraner mantra - name ki ase jay. Kahinir shesh-e Gogol hate tule ney Nikolai Gogol-er chhoto-galpor sankalan, ja tar baba take kaishore upahar diyechhilen, kintu nijer namer prati birag-bashata se etodin pare dekheni.
Jhumpa ei paribesh, ei jeeban-er katha tanr nijer americay prabasi bangali paribar-e baro hoye othar abhignata theke khubi antaranga bhabe janen. Sahaj gadye prabasi jeeban-er nehati sadharon dainandin nana ghatanar madhye tini sahasa pathak-ke kichhu chirantan jeeban-jigyasar mukhomukhi korie den. Boiti parte parte mul charitra guli, arthat Gogol ar tar Ma-Baba, hoye othhe amader kachher manush. Anyanya charitra guli abashya mone atota rekhapat korena. Jemon Gogol-er jeebane je bandhabeera ase ebong biday ney akasmat, bahyik taphat satteo chairtra hisebe tader jeno eki rakam mone hoy, kichhuta khamkheyali o atmokendrik. E chhara upanyasti pray sampurnobhabe hasya-koutuk-parihas barjito, ja charitro-gulir jeeban-er sankeerno gandee ar abohe bishader-r surer sathe milemishe majhemajhe bandho ghare abodhdhho thakar anubhuti jagate pare pathoker mane.
Tulanamulak bichar korte gele je upanyastir nam prathame mone hoy ta holo Sunil Gangopadhyay-er Purba Pashchim. Ete prabasi bangali jeeban-er tanaporener je chhabi peyechhi ta mane dag ketechhilo anek beshi. Sudhu tai noy, char-desh ardha shatak byapi ei kahinite aganito charitrer jeebansroter apato-bichchhinno dhara krame milemishe gie prabol kalarole pathak-ke bhasie niye jay je mohanar dike, sekhane nam-parichay abantar mone hoy. Ei upanyasti bangla pathakder kachhe ar panchta manoranjak lekhar sathe mile mishe tar prapya gurutto payni bole mone hoy. Ar ingreji bhashar deshi ba bideshi pathak der katojoni ba janen etir katha. Kichhu samasamayik bangla lekhar anubad holeo, deshe-bideshe tader prachar to khubi seemito. Ta na hole ar Salman Rushdie ki kore bolte paren je bharatiyo sahity-er sabcheye ullekhjogya kaj hochchhe ingreji bhashay, anchalik bhashay noy.
Ar bangla chhere antarjatik sahityer dike jadi takai, ingreji bhashay lekha abhibasee-jeeban niye samprati para kon upanyas-ti sabcheye bhalo legechhe jadi jigges koren, tar uttore je barnojjal upanyastir katha bolbo, ta holo England-e baro hoe otha Ingrej baba ebong Jamaican ma-er kanya Zadie Smith-er ekti prabasi Bangladeshi paribar ar ekti Jamaican-ingrej mishra paribar-er dui prajanma ke niye lekha “White Teeth”.
ARCHIVES.ANANDABAZAR.COM
Anandabazar Patrika - Book